0
                            নাথুরাম গডসে
গান্ধী হত্যাকাণ্ড উপমহাদেশের ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। গান্ধীর হত্যাকারী ছিলেন তার মতোই একজন উচ্চশ্রেণীর ব্রাহ্মণ। তার নাম নাথুরাম গডসে।
 নাথুরাম গডসে
জিবনপঞ্জীঃ-   নাথুরাম ভারতের বোম্বাই শহরের কাছে পুনায় জন্মগ্রহণ করে। কলেজ জীবন থেকে সে সাভারকাবের হিন্দু মহাসভা ও আরএসএস এর ফ্লাটফরমে কাজ করতো।
 গান্ধী হত্যার কারনঃ-  নাথুরাম গডসে হত্যাকারী হলেও তিনি অল্পশিক্ষিত ছিলেন না। গডসে ছিলেন তার সময়ের শিক্ষিত লোকদের একজন। হিন্দু ইতিহাস ও হিন্দু শাস্ত্র এবং তদানীন্তন ভারতীয় রাজনীতি সম্পর্কে ছিল তার গভীর জ্ঞান। হিন্দু মন-মানসিকতা ও চেতনার আলোকে তার কাছে মনে হয়েছিল, গান্ধী পাকিস্তান প্রতিষ্ঠায় সায় দিয়ে হিন্দুদের পুণ্যভূমিকে দ্বিখণ্ডিত করেছেন। গডসে বিশ্বাস করতেন, গান্ধী মুসলিম লীগ ও মুসলমানদের রাজনৈতিক ছাড় দিয়েছেন। হিন্দু স্বার্থের চেয়ে তিনি মুসলিম স্বার্থকে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছেন। জিন্নাহর প্রতি নমনীয় দৃষ্টিভঙ্গি প্রদর্শন করছেন। এছাড়া, গান্ধী রাষ্ট্রভাষা হিসাবে হিন্দির দাবিকে অগ্রাহ্য করেছেন। দক্ষিণ আফ্রিকায় গান্ধীর ভূমিকাকে নাথুরাম গডসে সমর্থন করলেও ভারতীয় রাজনীতিতে তার ভূমিকাকে পুরোটাই অন্যায় বলে বিবেচনা করেছেন। গান্ধীর অহিংস বাণী ও সত্যাগ্রহ ছিল তার দৃষ্টিতে হিন্দু ইতিহাসের পরিপন্থি। তিনি তাকে ব্রিটিশ অনুগত ব্যক্তি ছাড়া আর কিছু ভাবতে পারেননি।  গডসে এ সিদ্ধান্তে আসেন যে, জাগতিক বিচারে তার পরিণাম যাই হোক, পরজন্মে তিনি মুক্তি পাবেন। শুধু তাই নয়, গান্ধী হত্যাকাণ্ড সফল হলে তার স্বধর্মের অনুসারী ভারতের ৩০ কোটি হিন্দুও অবিচারের হাত থেকে নিষ্কৃতি পাবে। গান্ধী হত্যাকাণ্ডে এগুলোই ছিল নাথুরাম গডসের যুক্তি।
গান্ধী হত্যার পরিকল্পনাঃ-     ১৯৩৪ সালের জুলাই থেকে ১৯৪৪ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মোট ছয়বার গান্ধীকে হত্যা করার চেষ্টা করা হয়। নাথুরাম গডসে ১৯৪৬ সালের সেপ্টেম্বরে প্রথমবার গান্ধীকে হত্যার চেষ্টা করেন। ব্যর্থ হয়ে তিনি আবার ১৯৪৮ সালের ২০ জানুয়ারি একই চেষ্টা চালান। পরপর দু'বার ব্যর্থ হয়ে তৃতীয়বার ১৯৪৮ সালের ৩০ জানুয়ারি তিনি সফল হন। সেদিন গান্ধী দিলিস্নতে বিড়লা হাউসে এক প্রার্থনা সভায় যোগদান করেছিলেন। সেখানেই নাথুরাম গডসের গুলিতে তিনি নিহত হন। গান্ধীকে হত্যা করার জন্য গডসের কোনো অনুতাপ ছিল না। তিনি প্রাণভিক্ষাও চাননি। প্রাণদণ্ডের জন্য তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ প্রস্তুত।
গান্ধী হত্যার পরবর্তী ঘটনাবলীঃ-   ১৯৪৮ সালের ৩০ জানুয়ারি বিকেল ৪ টা ৫০ মিনিটে গান্ধীজি রুটিন মাফিক সর্বধর্মীয় প্রার্থনা সভায় বক্তব্য দিতে বের হন। তাকে বের করতেন দুজন তরুণী। এদের কাঁধে ভর দিয়ে বের হতেই নাথুরাম গডসে খুব কাছে থেকে গান্ধীজিকে রিভলবার থেকে গুলি করে। দুমিনিটেই স্তব্ধ হয়ে যায় একটি ইতিহাসের অধ্যায়। নাথুরাম এক পাও নড়লেন না। পিস্তলের গুলি যাতে অন্য কাউকেও আহত না করে সেজন্য পিস্তলসহ হাত উঁচু করে ধরে রাখলেন যতক্ষণ না পুলিশ এসে তাকে নিয়ে গেলেন। এক মাসের মধ্যে আরো সাতজনকে গ্রেফতার করে বিচার কার্য শুরু হয়। গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে নাথুর ভাই গোপাল গডসেও ছিলেন।
নাথুরাম গডসের আরও কিছু ঘটনাবলীঃ-     নাথুরাম কোন উকিল গ্রহণ করেনি। নিজ বক্তব্য নিজেই এজলাসে দিয়েছেন অনলবর্ষী ভাষায়। তার বক্তব্যের শ্রোতা পূর্ণ ছিল ভিআইপি গ্যালারী। এসব ভি.আই.পি’র মধ্যে পুরুষ ছিলেন না। সবাই ছিলেন জজ ব্যারিস্টারদের বউ। মৃত্যুদণ্ডাদেশের চারদিনের মধ্যে নাথুরাম আপিল করেন। কিন্তু সেখানেও তিনি অন্যান্য অভিযোগ অস্বীকার করেন ও হত্যার দায় নিজে নেন। তখন লক্ষ লক্ষ হিন্দু মুসলমান নিহত, গৃহত্যাগী, উদ্বাস্তু এসব কিছুর জন্য এজলাসে নাথুরাম গান্ধীজিকে দায়ী করেন। বিচারক জি.ডি খোসলা আপিল বিভাগের তিনজন বিচারকের একজন ছিলেন। তিনি গান্ধী হত্যা সম্বন্ধে স্মৃতিচারণমূলক বইয়ে লিখেছেন যে-সেদিন নাথুরামের আপিল বক্তব্যে উপস্থিত অনেকেই চোখের জল মুচেছেন। তারা গান্ধীর পরিবর্তে নাথুরামের জন্যই বোধ হয় কেঁদেছিল। বিচারক খোসলার মন্তব্যঃ সেদিন এজলাসে উপস্থিতরা যদি রায় দিত তবে নাথুরামকে নির্দোষ হিসেবে রায় দিলে আশ্চর্য হবার কিছু ছিল না।
আরও কিছু ঘটনাবলীঃ-     জেলে থাকা অবস্থায় কিছু চমকপ্রদ ঘটনা ঘটে। গান্ধীজির ছেলে রামদাস গান্ধী পিতার হত্যাকারী নাথুরামকে কয়েকটি চিঠি লিখেন। রামদাস নাথুকে ভগবত গীতা ও উপনিষদের বিভিন্ন উদ্ধৃতি দিয়ে প্রশ্ন করেন একজন বৃদ্ধ মানুষকে গুলি করে মারা তার ধার্মিক হৃদয় কিভাবে দেখে? রামদাস এই হত্যার জন্য অনুতপ্ত হয়ে নাথুকে ভগবানের কাছে ক্ষমা চাইতে উপদেশ দেন। নাথুরাম ভদ্র ভাষায় গান্ধীজির ছেলেকে প্রতি চিঠির উত্তর দেন। এসব চিঠির সারকথা হল অখণ্ড ভারত এর জন্যই তিনি গান্ধীজিকে হত্যা করেন দেশ ও মানুষের স্বার্থে।
আদালতে জবানবন্দীঃ-      আমি যা করেছি তার দায়-দায়িত্ব আমার। তাই আমি আমার দায়ের পরিণতি গ্রহণ করার জন্য আদালতে দাঁড়িয়েছি এবং বিচারক আমার প্রাপ্য শাস্তি আমাকে দেবেন। আমি আরো বলতে চাই, করুণার জন্য আমি প্রার্থনা করছি না। আমি এটাও চাই না কেউ আমার পক্ষ থেকে করুণা ভিক্ষা করুক। আমার এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই, সৎ ইতিহাসবিদগণ আমার কাজের যথাযথ মূল্যায়ন করবেন এবং ভবিষ্যতে একদিন প্রকৃত সত্যের মূল্য দেবেন।'
ফাসির আগের কিছু মুহুর্তঃ-    ফাঁসির আগে নাথুরামের স্লোগান ছিল অখণ্ড ভারত-অমর রহে। নাথুরাম মৃত্যুর একঘণ্টা আগে একটা উইল করে গিয়েছিলেন তার চিতা ভস্ম যেন গঙ্গায় না ফেলা হয়। যেদিন অখণ্ড ভারত পুনঃস্থাপিত হবে সেদিন যেন তার চিতা ভস্ম সিন্ধু নদীতে বিসর্জন দেয়া হয়। নাথুরামের পরিবারের কাছে এ ভস্ম রক্ষিত আছে। যতদিন অখণ্ড ভারত না হবে ততদিন এই ভস্ম বংশ পরম্পরায় রক্ষিত হবে। প্রতিবছর নাথুরামের মৃত্যুবার্ষিকীতে উৎসাহী তরুণরা এই ভস্ম সামনে নিয়ে তার স্মৃতি রোমন্থন করেন। ফাঁসির ৪৫ মিনিট আগে ১০০ রুপী সোমনাথ মন্দিরের জন্য দান করেন।
আর এও শোনা যায় দেশ ভাগের পর পাকিস্থান ভারতের কাছে ৫২ কোটি টাকা পেত। ভারতও ঐ টাকা ইনস্টলমেন্টে শোধ করে আসছিলো। কিন্তু হঠাৎ নেহেরু + প্যাটেল সরকার টাকা দেবেনা বলে সিন্ধান্ত নেয়। এতে গান্ধী অনশনে যান ... দাবী পাকিস্থানি ভাইয়ের টাকা শোধ করতে হবে। বাধ্য হয়ে নেহেরু/প্যাটেল এসে বলেন যে আপনি অনশন ভঙ্গ করেন, আমরা টাকা শোধ করে দেব।
এসব ঘটনাবলী নাথুরাম গডসের হৃদয়ে কন্টকের মতো বার বার আঘাত করতো।

কৃতজ্ঞতা স্বিকার:        wikipedia,internet

Post a Comment

 
Top